শুক্রবার, ১৪ জুন ২০২৪

বাংলাদেশের উপকূলে রিমেলের আঘাত: দেড় লাখ ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত

রিমালে বিপর্যস্ত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জনজীবন ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে ৭ জেলায় ১২ জনের মৃত্যু : বাঁধ ভেঙে প্লাবিত গ্রামের পর গ্রাম : তলিয়েছে ফসলের মাঠ ভেসেছে পুকুর : ১৫ হাজার মোবাইল টাওয়ার বন্ধ : ভেসে গেছে ৩ হাজার চিংড়ি ঘের : ক্ষতবিক্ষত সুন্দরবন

প্রবল ঘূর্ণিঝড় রিমালের আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে গোটা উপকূলীয় অঞ্চল। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অন্তত ৩০ জেলার মানুষ। এর প্রভাবে সারাদেশে ঝড়ো হাওয়া আর বৃষ্টির ফলে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। ঘর-বাড়ি, গাছপালা ভেঙে পড়ে অনেক এলাকা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে প্রায় ৩ কোটি গ্রাহক। বিদ্যুৎ না থাকায় বন্ধ হয়ে যায় ১৫ হাজার মোবাইল টাওয়ার। এতে মোবাইল নেটওয়ার্কও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এ ছাড়া ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। যে বন নিজের বুকপেতে দিয়ে অতীতের আইলা, সিডরসহ অন্যান্য ঘূর্ণিঝড়ের মত এবারও বাংলাদেশকে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে বাঁচিয়েছে।
ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে দেশের উপকূলীয় জেলা খুলনা, সাতক্ষীরা, বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা, নোয়াখালী ও চট্টগ্রামে অন্তত ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে খুলনায় এক, সাতক্ষীরায় এক, বরিশালে তিন, পটুয়াখালীতে এক, ভোলায় তিন, চট্টগ্রামে একজনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। ঘর, গাছ ও দেয়াল চাপা এবং পানিতে ডুবে তাদের মৃত্যু হয়েছে বলে মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিংয়ে জানানো হয়। ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবে আংশিক এবং সম্পূর্ণ মিলে ১ লাখ ৫০ হাজার ৪৭৫টি ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে ডুবে গেছে সুন্দরবনের ব্যাপক অঞ্চল। এতে ভয়াবহ বিপদে পড়েছে সুন্দরবনের প্রাণীকুল। জলোচ্ছ্বাসে চিংড়ি ঘের ও পুকুরের মাছ ভেসে গেছে তলিয়ে গেছে ফসলি জমি। এতে কৃষির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ভোলায় বেড়ি বাঁধ ধসে প্লাবিত হয়েছে অন্তত ৩০ গ্রাম। বাগেরহাটে সাড়ে ৩ হাজার চিংড়ি ঘের ও পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। এতে ৭৩ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানাগেছে। এছাড়া ১ হাজার ৫শ’ ৮১ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় রিমালের প্রভাবে হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে আন্তর্জাতিক রুটের ১০টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়। এতে সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানো নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন মালয়েশিয়াগামী অন্তত ৩০ জন শ্রমিক। ঘূর্ণিঝড়ের কারণে তৃতীয় ধাপের ১৯ উপজেলার নির্বাচন স্থগিত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। গতকাল ইসি সচিব মো. জাহাংগীর আলম সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। যে ১৯ উপজেলার ভোট স্থগিত করা হয়েছে সেগুলো হলো- বাগেরহাট জেলার শরণখোলা, মোড়েলগঞ্জ, মোংলা, খুলনা জেলার কয়রা, পাইকগাছা, ডুমুরিয়া, বরিশালের গৌরনদী, আগৈলঝাড়া, পটুয়াখালী জেলার সদর, মির্জাগঞ্জ, দুমকী, পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া, ভোলার লালমোহন, তজুমদ্দিন, ঝালকাঠির রাজাপুর, কাঁঠালিয়া, বরগুনার বামনা, পাথরঘাটা ও রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি।
খুলনা ব্যুরো ও কয়রা সংবাদদাতা জানান, উপকূলীয় উপজেলা কয়রায় জলোচ্ছ্বাসে বেড়িবাঁধের ৩টি স্থানে ভেঙে গেছে। এতে অন্তত ২০গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। নদীর পানিতে তলিয়ে গেছে শতাধিক চিংড়ি ঘের। ভেঙে গেছে মাটির তৈরি কাঁচা ঘরবাড়ি ও দোকানপাট। জানা যায়, গত রোববার দুপুর থেকে নদীর জোয়ারের চাপে উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়নের দশহালিয়া, মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের সিংহেরকোণা ও দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বেড়ি বাঁধ ভেঙে যায়। সবমিলিয়ে প্রায় ১৫০ মিটার ভেঙে নোনা পানিতে প্লাবিত হয়েছে অন্তত ২০টি গ্রাম।
এছাড়া অনেক এলাকায় বেড়িবাঁধ নিচু থাকায় সেইসব জায়গা দিয়ে পানি উপচে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করছে। কয়রার মহারাজপুর ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ জানান, রোববার মধ্য রাতের দিকে জোয়ারের চাপে এ ইউনিয়নের দশহালিয়া এলাকায় প্রায় ৫০ মিটার বাঁধ ভেঙে কপোতাক্ষ নদের পানি ঢুকে পড়েছে। এতে অন্তত দুটি গ্রাম এবং কয়েকশ’ চিংড়ির ঘের তলিয়ে গেছে। কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবিএম তারিক উজ জামান জানান, কয়েকটি স্থানে বাঁধ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।
এছাড়া ভারী বৃষ্টি ও ঝড়ের তাণ্ডবে অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) বিএম তারিক-উজ-জামান জানান, কয়েকটি স্থানে বাঁধ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এ ছাড়া ভারী বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার তাণ্ডবে অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জেনেছি। সেগুলো মেরামতের জন্য পাউবোর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে নির্দশনা দেওয়া হয়েছে।
মোংলা সংবাদদাতা জানান, মোংলায় গত রোববার সকাল থেকে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন বাগেরহাট জেলার অধিকাংশ এলাকা। প্রায় পাঁচ লাখ গ্রাহক বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন আছে। এর মধ্যে মোড়েলগঞ্জ, শরণখোলা, মোংলা ও রামপাল উপজেলার প্রায় অধিকাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ নেই। অন্যান্য এলাকাতেও বিদ্যুৎ ছিল আশা যাওয়ার মধ্যে। বাগেরহাট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক সুশান্ত রায় জানান, ঝড়ো হাওয়ায় বিদ্যুতের লাইনে গাছপালা উপড়ে পড়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে । বাগেরহাট জেলায় চার লাখ ৮৫ হাজারের বেশি গ্রাহক রয়েছে। রিমালের প্রভাবে দমকা ঝোড়ো হাওয়ায় পল্লী বিদ্যুতের মূল সঞ্চালন লাইনের বিভিন্ন স্থানে গাছপালা উপড়ে পড়ায় বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ঝড়ে বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎতের তার ছিড়ে পড়েছে। রোমেলের আঘাতে মোংলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অপরদিকে বন্ধ রয়েছে মোংলা বন্দরে অবস্থানরত সকল বাণিজ্যিক জাহাজের পণ্য ওঠানামার কাজ । মোংলা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. জাফর রানা জানান, ঝড়ে এখানখার প্রায় ৮ হাজার কাঁচা ও আধাপাকা ঘরবাড়ী, ব্যাপক গাছপালা বিধ্বস্তসহ বৈদ্যুতিক খুটিপিলার পড়ে গেছে। ১০ থেকে ১২গ্রাম প্লাবিত হয়ে জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছে প্রায় ৬০হাজার মানুষ। বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মোহা. খালিদ হোসেন ইনকিলাবকে জানান, এখন পর্যন্ত ৪ হাজার ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত ও ১০ হাজার মানুষ পানিবন্দি। এই সকল লোকের জন্য দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।শরণখোলা উপজেলার রায়েন্দা ইউনিয়নের রাজৈর এলাকায় বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করেছে।
ভোলা জেলা সংবাদদাতা জানান, ভোলায় রিমালের তান্ডবে ঘরচাপায় এক শিশুসহ তিন জন নিহত হয়েছে। এসময় আহত হয়েছেন অন্তত ২০ জন। ঝড়ের কবলে বেড়ি বাঁধ ধসে প্লাবিত হয়েছে ৩০ গ্রাম। নিহতরা হলেন, মনেজা খাতুন, জাহাঙ্গীর ও মাইশা। ইনকিলাবের লালমোহন উপজেলা সংবাদদাতা জানান, নিহত মনেজা খাতুন লালমোহন উপজেলার পশ্চিম চরউমেদ ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের চরউমেদ গ্রামের তেলী বাড়ির আব্দুল কাদেরের স্ত্রী। স্থানীয়রা জানান, ওই নারী ও তার এক নাতী ঘরে ঘুমিয়েছিলেন। ভোর আনুমানিক ৪টার দিকে ঝড়ো বাতাসে টিনের ঘর ভেঙে চাপা পড়ে তিনি ঘটনাস্থলে তার মৃত্যু হয়। লালমোহন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তৌহিদুল ইসলাম এ তথ্য জানান।
অপর দিকে দৌলতখান উপজেলায় ঘূর্ণিঝড় রিমালের আঘাতে পৌরসভার ২নম্বর ওয়ার্ডে গাছ উপড়ে পড়ে ঘরের ভিতর চাপা পড়ে মাইশা নামের ৪ বছেরর এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। মাইশা একই এলাকার প্রতিবন্ধী মমিনের মেয়ে। এছাড়া বোরহানউদ্দিন উপজেলার সাচড়া ইউনিয়ন ৬ নম্বর ওয়ার্ডে জাহাঙ্গীর নামের চাপায় নিহত হয়েছে।
এছাড়া নদ-নদীর পানি স্বাভাবিকের চেয়ে ৪ থেকে ৫ ফুট বৃদ্ধি পেয়ে চরফ্যাশন উপজেলার ঢালচর, কুকরি-মুকরি ইউনিয়ন তলিয়ে গেছে পানির নিচে। এছাড়া মনপুরা, লালমোহন ও দৌলতখান উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকার লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। বহু মানুষের পুকুর ও মাছের ঘের, রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্টসহ তলিয়ে গেছে বহু স্থাপনা।
ভোলার জেলা প্রশাসক আরিফুজ্জামান ইনকিলাবকে জানান, নিহত, আহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবারকে তালিকা করে সহায়তা দেওয়া হবে। মেডিক্যাল টিম গঠন করা হয়েছে, আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে এবং আশ্রীতদের শুকনো খাবারের ব্যাবস্থা করা হয়েছে।
বাগেরহাট জেলা সংবাদদাতা জানান, বাগেরহাটে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। রিমালের প্রভাবে বিধ্বস্ত হয়েছে জেলার ৪৫ হাজার ঘরবাড়ি। এর মধ্যে আংশিক বিধ্বস্ত হয়েছে ৩৫ হাজার ও পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়েছে ১০ হাজার বাড়িঘর। উপড়ে পড়েছে কয়েক হাজার গাছপালা। বিদ্যুৎতের খুটি উপড়ে পড়ায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে জেলা সদরসহ সবকটি উপজেলা। জেলার নিম্নাঞ্চল ৩ খেকে ৫ ফুট পানিতে প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে জেলার প্রায় অর্ধলক্ষ পরিবার। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে মৎস্য ঘেরে। বিভিন্ন উপজেলায় সাড়ে ৩হাজার চিংড়ি ঘের ও পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। জেলা মৎস্য অফিস জানায়, ৭৩ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। জেলা প্রশাসক মো. খালিদ হোসেন ইনকিলাবকে জানায়, জেলার শরণখোলা, মোরেলগঞ্জ ও মোংলা উপজেলায় সব থেকে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এসব উপজেলার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত। আবহওয়া পুরোপুরি স্বাভাবিক হলে ক্ষয়ক্ষতির সঠিক তথ্য জানা যাবে। জেলার ৩৫৯টি আশ্রয় কেন্দ্রে প্রায় লক্ষাধিক মানুষ ও কয়েক হাজার গবাদি পশু আশ্রয় নিয়েছেন।
ঝালকাঠি জেলা সংবাদদাতা জানান, ঝালকাঠিতে দমকা বাতাস আর বৃষ্টির সাথে জলোচ্ছ্বাসে তলিয়ে গেছে নদীতীরবর্তী শহর এবং গ্রামের অধিকাংশ এলাকা। জেলা শহরের সুগন্ধা নদী পাড়ের পৌরসভা খেয়াঘাট, কাঠপট্টি, কলাবাগান, সুতালড়িসহ এলাকাগুলো কোমড় সমান পানিতে তলিয়ে গেছে। নদীর পানি বেড়েছে ৫ থেকে ৭ ফুট। চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের ঘরে ঘরে এখন কোমড় পানি। একই সাথে দমকা বাতাশ আর বৃষ্টিতে চরম দুরাবস্থা বিরাজ করছে। গত রোববার রাত দেড়টা থেকে শুরু হওয়া ঝড়ো হাওয়া, বৃষ্টি আর পানির চাপ অব্যাহত আছে। জেলার শতাধিক গ্রামের মানুষ এখন পানিবন্দি হয়ে আছে। ঘর থেকে বের হতে পারছেন না তারা। তিন হাজারেরও বেশি মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে। ঝালকাঠির জেলা প্রশাসক ফারাহ গুল নিঝুম ইনকিলাবকে জানান, আমরা পর্যাপ্ত আশ্রয় কেন্দ্র খুলে রেখেছি। এখনো যারা আসেনি, তারা এখানে আসতে পারেন। আশ্রয় কেন্দ্রে খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। জেলায় নিন্মাঞ্চল তলিয়ে গেছে।
রাজাপুর (ঝালকাঠি) উপজেলা সংবাদদাতা জানান, রাজাপুরে জলোচ্ছ্বাসে বিষখালী তীরবর্তী এলাকা সহ রাজাপুর শহরের বাসা বাড়ী সহ ৫৪ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ সাইক্লোন সেল্টারে নারী শিশু বৃদ্ধ, ছাত্র ছাত্রীরা আশ্রয় নিয়েছে। উপজেলা প্রাশন থেকে শুকনো খাবার সরবরাহ করছে। গাছ পালা বাড়িঘর স্কুল মাদরাসা কাঁচাপাকা ঘর ছাউনী উড়ে যায়। ১০ থেকে ১২ ফুট বৃদ্ধি পাওয়ায় রাস্তা ঘাট, মাঠ পানির নীচে। গত ২৪ ঘণ্টা উপজেলার সর্বত্র বন্ধ রয়েছে।বিদ্যুতে খুটি ভেঙে পড়েছে। এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত প্রশাসনের কোন ব্যক্তির সাথে যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।
চরফ্যাসন (ভোলা) সংবাদদাতা জানান, চরফ্যাসনের বিভিন্ন এলাকা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপজেলা ঢালচর, চর নিজাম, চর ফারুকি, মুজিব নগর, চর কুকরি মুকরি ইউনিয়নের চর পাতিলার নিম্নাঞ্চলে অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধি পেয়ে বহু মানুষের ঘরবাড়ি প্লাবিত হয়ে সমুদ্রের পানিতে তলিয়ে গেছে। এ ছাড়া গবাদি পশু, পাখি ঢেউয়ের পানিতে ভেসে গেছে। মৎস্য খামারিদের মৎস্য ঘের পানিতে তলিয়ে গেছে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে উপকূলের অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ। বিধ্বস্ত হয়েছে উপজেলার ৫ হাজারেরও বেশি বাড়িঘর, এর ফলে গৃহহীণ হয়ে পড়েছে কয়েক হাজার মানুষ। এদিকে ঘূর্ণিঝড় আক্রান্ত এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য নেওয়া মানবিক সহায়তা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নওরীন হক জানান, উপজেলা প্রশাসন ঘূর্ণিঝড় রেমালের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় অসহায় মানুষের জন্য কাজ করছে। আমি অনেক এলাকা পরিদর্শন করেছি। আশ্রয়কেন্দ্র গুলোতে খাবার বিতরণ করছি। সার্বিক বিষয় মনিটরিং করা হচ্ছে।
আরিচা সংবাদদাতা জানান, দুর্ঘটনা এড়াতে কর্তৃপক্ষ আরিচা-কাজিরহাট ও পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া এবং ধাওয়াপড়া-নাজিরগঞ্জ নৌ-পথে ফেরি, লঞ্চ ও স্পিডবোটসহ সকল ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়। গতকাল দুপুরে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) আরিচা বন্দরের ট্রাফিক সুপারভাইজার আফছার আলী এ তথ্য জানিয়েছেন। ফেরি চলাচল বন্ধ থাকায় এসব ফেরিঘাটে পণ্যবাহী ট্রাকে সাড়ি রয়েছে। এতে দুর্ভোগের শিকার হন ট্রাক চালক ও শ্রমিকরা।
স্টাফ রিপোর্টার চাঁদপুর থেকে জানান, জেলায় গতকাল ভোর ৪টা ২০ মিনিট থেকে বেলা পৌনে ১২টা পর্যন্ত ৭২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। গত রোববার মধ্যরাত থেকে চাঁদপুর-ঢাকাসহ সব নৌ রুটে নৌ-যান চলচাল বন্ধ রয়েছে। গতকাল বৃষ্টির কারণে বন্ধ রয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। শহরের লঞ্চঘাটের প্রবেশ এলাকা মাদরাসা রোডে বাতাসে গাছ উল্টে সড়কে পড়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া মেঘনার পশ্চিমাঞ্চলে চরাঞ্চলের সড়ক ও বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
কক্সবাজার জেলা সংবাদদাতা জানান, জেলায় রোববার রাত ১০টা থেকে শুরু হওয়া এই বর্ষণ গতকাল সোমবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। থেমে থেমে চলা এ বর্ষণের সঙ্গে ঝড়ো হওয়া এবং বজ্রপাতও হয়। এতে কক্সবাজার উপকূলবর্তী নিম্নাঞ্চলের অন্তত ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। কক্সবাজার সমুদ্র বন্দরে ৯ নম্বর মহাবিপদ সঙ্কেত নামিয়ে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সঙ্কেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। বৃষ্টি এবং জোয়ারের পানিতে কক্সবাজারের অন্তত ৩০ গ্রাম প্লাবিত হওয়ার তথ্য জানিয়েছেন স্থানীয় লোকজন ও জনপ্রতিনিধি।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মুহম্মদ শাহিন ইমরান ইনকিলাবকে জানিয়েছেন, পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণদের নিরাপদে আশ্রয় নিতে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও জনপ্রতিনিধি কাজ করছেন। সহজে নিরাপদে আশ্রয় না নিলে জোরপূর্বক সরানো হবে।
গলাচিপা (পটুয়াখালী) উপজেলা সংবাদদাতা জানান, গলাচিপার সাথে সারাদেশের সড়ক যোগাযোগের রাস্তাটি ফাটল দেখে দিয়েছে। এতে করে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। উপজেলার গোলখালী ইউনিয়নের মুশুরিকাঠি গ্রামের স্লুইস গেটটির রাস্তাটি দেবে গেছে। স্লুইস গেটটি রক্ষায় কিছুদিন আগে মেরামত করা হলেও পানির চাপে তা টিকতে পারেনি। জোয়ারের পানি ও প্রবল বৃষ্টিতে গলাচিপা উপজেলার ২৫ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ব্যাপক গাছ ভেঙে গেছে। গতকাল সোমবার বিকেল ৪টা এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত গলাচিপা উপজেলায় প্রবল বৃষ্টিপাত ও ঝড়ো হাওয়া বইছে। এতে করে ঘরবন্দী উপকূলবাসী। গত ২৪ ঘণ্টা ধরে বিদুৎ বিচ্ছিন্ন। রোববার রাতে পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক মো নূর কুতুবুল আলম গলাচিপা উপজেলার বেড়িবাঁধ ও আশ্রয়ণ কেন্দ্র গুলো পরিদর্শন করেছেন। এদিকে উপজেলার ডাকুয়া ইউনিয়নের আটখালী গ্রামে আধা কিলোমিটার রাস্তা বেড়িবাঁধ না থাকায় রাবনাবাদ নদীর পানি বৃদ্ধি ও অবিরাম বর্ষণে সাধারণ রাস্তার উপর দিয়ে পানি ঢুকছে লোকালয়ে।
স্টাফ রিপোর্টার, লক্ষ্মীপুর থেকে জানান, জেলার রামগঞ্জ উপজেলায় ঘূর্ণিঝড় রেমাল তাণ্ডবে বসত ঘরের নিছে চাপা পড়ে নিস্পা নামের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে । গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছেন হোসনেয়ারা নামের আরেক নারী। উপজেলার ৫ নম্বর চন্ডিপুর ইউনিয়নে দক্ষিণ চাঙ্গিরগাঁ গ্রামের দেবুর বাড়ির পাশে গরুর ব্যাপারী ছাকায়েত উল্যার বাড়িতে লুৎফর রহমান এর বসত ঘরটি ঘূর্ণিঝড় রেমেলের আঘাতে ভেঙে পরে এসময় ঘরটিতে তার স্ত্রী হোসনেয়ারা ও নাতনি নিস্পু অবস্থান করছিল। স্থানীয়রা হোসনেয়ারা ও নিস্পুকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক নিস্পুকে মৃত ঘোষণা করে। এই ঘটনায় এলাকায় শোক বিরাজ করছে।
নোয়াখালী জেলা সংবাদদাতা জানান, জেলায় মধ্যরাত থেকে শুরু হয় দমকা হাওয়া। জোয়ারের পানিতে হাতিয়া উপজেলার নিঝুম দ্বীপ, চরঘাসিয়া, ঢলচরসহ বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। এতে কিছু কাঁচা ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শুভাশিস চাকমা জানান, প্লাবিত হওয়া এলাকা থেকে পানি নামতে শুরু করেছে। পুনরায় জোয়ার এলে আবারও প্লাবিত হতে পারে। কাঁচা ঘরবাড়ি ও গাছপালার ক্ষতি হয়েছে। অন্যদিকে উপকূলীয় কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সিপিপি (ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি) টিম লিডার ইলিয়াছ মিয়া ইনকিলাবকে জানান, রোমালের প্রভাবে দিয়ারা বালুয়া, গুচ্ছ গ্রাম, দক্ষিণ মুছাপুর, চরএলাহি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। স্বাভাবিকের জোয়ারের চেয়ে ৩ থেকে ৫ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে নিমজ্জিত হয়েছে বিস্তীর্ণ এলাকা। এসব এলাকার সাইক্লোন সেন্টার বা আশ্রয়কেন্দ্রে কেউ আশ্রয় নিতে আসেনি।
গোদাগাড়ী (রাজশাহী) উপজেলা সংবাদদাতা জানান, গোদাগাড়ীে কৃষকের স্বপ্ন বৃষ্টির পানিতে ভেঁসে গেছে। মাঠের মধ্য পালা দেয়া ধান বৃষ্টি দমকা হাওয়ায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, ভিজে ধানে গাছ বের হয়ে গেছে। সবজি ও ফসলি জমি ডুবেগেছে বৃষ্টির পানিতে। রিমালের প্রভারে আম পড়েছে ও পাঁকা ধান নষ্ট হয়েছে।
পেকুয়া (কক্সবাজার) উপজেল সংবাদদাতা জানান, পেকুয়ায় রাজাখালী ইউনিয়েনের দশেরঘোনা পাড়ায় বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে লোকালয় প্লাবিত হয়েছে। সোমবার দুপুর আড়াই টার দিকে উপজেলার রাজাখালী ইউনিয়নের দশেরঘোনা পাড়া এলাকায় পাউবো নিয়ন্ত্রিত বেড়িবাঁধ জোয়ারের পানির স্রোতে ভেঙে যায়। এরফলে ওই গ্রামের আশপাশের বাড়িতে পানি ঢুকে পড়েছে। ভেসে গেছে পুকুরের মাছ।
ফেনী জেলা সংবাদদাতা জানান, ফেনীতে বাতাসের তীব্রতা বেশি হওয়ায় মানুষের বসতঘর বিধ্বস্ত হয়েছে এবং গাছপালা ভেঙে পড়েছে সড়কে ও ঘরের চালে। অনেকস্থানে বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। ফলে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে পুরো জেলার লাখ লাখ মানুষকে। এদিকে সোনাগাজী সদর ইউনিয়নের জেলে পাড়ায় নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে নিম্মাঞ্চল প্লাবিত হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কামরুল হাসান বলেন, রবিবার রাত থেকে ঝড়ো হাওয়া ও বৃষ্টিপাত শুরু হওয়ার পর আমাদের প্রশাসনের পক্ষ থেকে উপজেলার সব এলাকার প্রতিনিধি ও সিপিপির স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে কথা বলে সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি।
কেশবপুর (যশোর) উপজেলা সংবাদদা জানান, উপজেলা জুড়ে বিদ্যুৎ না থাকায় ভূতুড়ে জনপদে রুপ নেয়। পৌরশহরের পানি সরবারহ বন্ধ থাকায় এবং বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় পৌর নাগরিকের দুর্ভোগের সীমা ছিল না। ঝড়ে শাক-সবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে মাচায় চাষ করা সবজির ক্ষেত মাটিতে মিশে গেছে।
পটুয়াখালী জেলা সংবাদদাতা জানান, পটুয়াখালীতে আরও ২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এরা হচ্ছেন দুমকি উপজেলার জয়নাল আবেদীন হাওলাদার ও বাউফল উপজেলার নাজিরপুর এলাকার আব্দুল করিম। এনিয়ে গত দুদিনে পটুয়াখালীতে ঘূর্ণিঝড়ে মোট ৩ জনের মৃত্যু হয়। রিমালের প্রভাবে পটুয়াখালী জেলা শহর সব সমগ্র পটুুয়াখালী জেলাবাসী প্লাবিত অবস্থার মধ্যে রয়েছে।
সাতক্ষীরা জেলা সংবাদদাতা জানান, সাতক্ষীরার উপকূলীয় উপজেলা শ্যামনগর ও আশাশুনিতে জোয়ারের পানিতে বেড়িবাঁধ উপচে এবং প্রবল বর্ষণে শত শত মৎস্যঘের প্লাবিত হয়। ঘূর্ণিঝড়ে উপকূলীয় এলাকার ৫৪১ কাঁচা ঘরবাড়ি ধ্বসে গেছে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে উপকূলীয় এলাকাসহ সাতক্ষীরা জেলা শহর বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এদিকে, সাতক্ষীরা-মুন্সীগঞ্জ সড়কের একাধিক পয়েন্টে গাছগাছালি ভেঙে পড়ায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ইনকিলাব প্রতিবেদন

আরো পড়ুন ...