রবিবার, ১৪ জুলাই ২০২৪

ইমরান খানের গ্রেফতারে ক্ষোভে ফেটে পড়েছে পাকিস্তান

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে গ্রেপ্তারের পর ক্ষোভে ফেটে পড়েছে গোটা পাকিস্তান। ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধ করে দিয়েও পরিস্থিতি সামাল দিতে পাড়ছে না সরকার। পিটিআই’র আহবানে সাড়া দিয়ে গোটা দেশে বিক্ষোভ শুরু করেছে মানুষ। এবারের ক্ষোভ সব সামরিক বাহিনীর ওপরে। দেশের বিভিন্ন স্থানে সামরিক বাহিনীকেই টার্গেট করেছে ইমরান সমর্থকরা। এছাড়া রাজধানীর উচ্চ নিরাপত্তা জোনেও পুলিশের মুখোমুখি হয়েছে পিটিআই কর্মীরা। 

এরইমধ্যে ইসলামাবাদ হাই কোর্ট জানিয়েছে, বৈধ প্রক্রিয়ায়ই গ্রেপ্তার করা হয়েছে ইমরান খানকে। গ্রেপ্তারের পর এর পক্ষে-বিপক্ষে পাল্টাপাল্টি দাবি তুলছে সরকার ও পিটিআই। সরকারের তরফ থেকে এমন পদক্ষেপকে স্বাগত জানানো হলেও পিটিআই দেশব্যাপী এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছে। পিটিআই কর্মীদের থামাতে রাজধানী ইসলামাবাদসহ বেশ কিছু এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। তারপরেও দেশের প্রায় প্রতিটি শহরেই রাতভর বিক্ষোভ করেছে ইমরান সমর্থকরা। 
করাচিভিত্তিক গণমাধ্যম ডন জানিয়েছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে টুইটারসহ সকল সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধ রাখা হয়েছে।

এতে আন্দোলনকারীরা আরও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তাদের প্রধান টার্গেট ছিল পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী। ইমরান খান তাকে গ্রেপ্তার ও হত্যা চেষ্টার জন্য বরাবরই সামরিক বাহিনীকে দায়ী করেছেন। এবার তাকে গ্রেপ্তারের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে সামরিক বাহিনীর অবস্থানে হামলা হয়েছে। লাহোরে এক সেনা কর্মকর্তার বাড়িতে তাণ্ডব চালিয়েছে পিটিআই কর্মীরা। অপরদিকে রাওয়ালপিন্ডিতে সামরিক বাহিনীর হেডকোয়ার্টারের গেটেও বিক্ষোভ করেছে পিটিআই। সেখানে তারা রাস্তা ঘিরে শুয়ে থাকেন। 

করাচি এবং লাহোরে ইমরান খানের সমর্থকদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ টিয়ারগ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করেছে। অন্যদিকে বিক্ষোভকারীরা ইসলামাবাদ, রাওয়ালপিন্ডি, পেশোয়ার, ফয়সালাবাদ, মুলতান, কোয়েটাসহ বড় শহরগুলোর রাস্তা অবরোধ করে রেখেছে। ইন্সপেক্টর জেনারেল আকবর নাসির খান আদালতে অভিযোগ করেছেন যে, ইমরান খানকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন। অপরদিকে পিটিআই জানিয়েছে, ইমরান খানের সমর্থক ও আইনজীবীকে মারধর করে তাকে ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
রাওয়ালপিন্ডি ও ইসলামাবাদে পুলিশ ও পিটিআই কর্মীদের মধ্যে সহিংস সংঘর্ষ দেখা গেছে। রাওয়ালপিন্ডিতে জিএইচকিউ এবং হামজা ক্যাম্পের মতো স্পর্শকাতর অবস্থানে হামলা চালিয়েছে পিটিআই। এসময় দুই পুলিশ কর্মকর্তা আহত হন। ইসলামাবাদ ও রাওয়ালপিন্ডির মধ্যেকার মেট্রো সেবা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। লাহোরে পিটিআই কর্মীরা লিবার্টি চকে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করে। সেখান থেকে তারা ক্যান্টনমেন্টের দিকে বিশাল মিছিল নিয়ে রওনা দেয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘোষণা দেয়া হয় যাতে সব মানুষ ক্যান্টনমেন্টে পৌঁছায় এবং এটিকে ঘিরে ফেলে। বিভিন্ন ফুটেজে দেখা যায়, পিটিআই কর্মীরা লাঠি ও পার্টির পতাকা নিয়ে এক সেনা কম্যান্ডারের বাড়ির চারদিকে অবস্থান নিয়েছে। এরপর তারা জোরপূর্বক ওই বাড়িতে প্রবেশ করে এবং ভাংচুর চালায়। ভেতরে থাকা টিভি, ফার্নিচার এবং দরজা-জানালে ভাঙতে দেখা যায় তাদের। এরপর বাড়ি ও পাশে থাকা গাছ পালায় আগুন লাগিয়ে দেয় তারা। 

আরেক ভিডিওতে দেখা গেছে পিটিআই সমর্থকরা সামরিক বাহিনীর গাড়ি বহর থামিয়ে তাতে হামলা চালিয়েছে। বোতল ও পাথর ছুঁড়ে গাড়ি ভাঙার চেষ্টা করছে তারা। এছাড়া ফর্ট্রেস স্টেডিয়ামের বাইরে একটি পুলিশের গাড়িও আগুনে জ্বালিয়ে দেয় ইমরান সমর্থকরা। আগুন ধরানো হয় একাধিক নিরাপত্তা চৌকিতেও। 
লাহোরের পাশাপাশি তাণ্ডব চলেছে করাচিতেও। সেখানে শতশত পিটিআই কর্মী রাস্তা দখল করে রেখেছে। সিন্ধু প্রদেশের প্রধান সড়কগুলোও বন্ধ হয়ে আছে। পুলিশ সেখানে গণগ্রেপ্তার চালাচ্ছে। গ্রেপ্তার হয়েছেন বেশ কয়েক জন এমপি ও বহু কর্মী। ইমরানের গ্রেপ্তারের এক ঘণ্টার মধ্যেই সিন্ধুর শরিয়া ফয়সাল এলাকা যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। পিটিআই’র করাচি অঞ্চলের প্রেসিডেন্ট আফতাব সিদ্দিকি সমর্থকদের দ্রুত পার্টি হেডকোয়ার্টারে জড়ো হওয়ার আহ্বান জানান। তবে পুলিশ তাদেরকে মাঝপথে বাধা দেয়ার চেষ্টা করলে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় শরিয়া ফয়সালসহ আশেপাশের বেশ কিছু এলাকা। পুলিশ টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করলে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে ইমরান সমর্থকরা। তারা পাথর ছুঁড়ে এর জবাব দিতে থাকে। প্রায় তিন ঘণ্টা ব্যাপী লড়াইয়ে এক ডজনেরও বেশি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। এছার পাকিস্তান রেঞ্জার্সের একটি কার্যালয়, পুলিশের একটি কার্যালয় এবং গাড়িতেও আগুন ধরিয়ে দেয় ইমরান খানের লোকেরা। 

একই চিত্র দেখা গেছে খাইবার পাখতুনখাওয়াতেও (কেপি)। সেখানে পিটিআই প্রধানের গ্রেপ্তারের বিষয়ে জানার পরে, বিরোধী দলের অনেক কর্মী গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড অবরোধ করে পেশোয়ারের হাতনগর চকে পৌঁছায়। বিক্ষোভকারীরা চাঘি পাহাড়ের একটি রেপ্লিকা জ্বালিয়ে দেয়। সেখানে পাকিস্তান ১৯৯৮ সালে প্রথম পারমাণবিক পরীক্ষা চালিয়েছিল। তারা প্রাদেশিক পরিষদের ভবনের প্রধান ফটকও ভেঙে দেয় এবং প্রাঙ্গণের ভিতরে পাথর ছুড়ে মারে।

কোয়েটায় ইমরান খানের গ্রেপ্তারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের সময় পিটিআই কর্মী ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে একজন নিহত এবং ৬ পুলিশ কর্মী আহত হন। গিলগিট-বালতিস্তানে বিক্ষোভকারীরা কারাকোরাম হাইওয়ে সহ বিভিন্ন পয়েন্টে অনেক রাস্তা অবরুদ্ধ করে রেখেছে। এতে আটকা পড়ে আছেন বহু যাত্রী। মানব জমিন

আরো পড়ুন ...