রবিবার, ৩ মার্চ ২০২৪

আজ পয়লা বৈশাখ ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

আজ পহেলা বৈশাখ। পুরাতন ফেলে বাংলা বর্ষপঞ্জিতে যুক্ত হলো নতুন বাংলা বর্ষ ১৪৩০। বাংলা নতুন বছরের শুরুতে বৈশাখে বর্ণিল উৎসবে সাজবে দেশ। ভোরের প্রথম আলো ফুটার সাথে সাথে বছর বরণে চারুকলার দিকে ছুটবে রাজধানীর কিছু মানুষ। সে সাথে রাজধানী এবং সারা দেশজুড়ে থাকবে বর্ষবরণের নানা আয়োজন। তবে বর্ষবরণে রমজানের পবিত্রতা যাতে নষ্ট না হয় সেদিকে সংশ্লিষ্টরা দৃষ্টি রাখবেন এমনটাই প্রত্যাশা ধর্মপ্রাণ মানুষের।
গতকাল ছিল বাংলা বর্ষের শেষ দিন। বাংলার চিরায়ত উৎসব চৈত্র সংক্রান্তি। শেষ সূর্যাস্তের সাথে বিলীন হয়ে গেল আরেকটি বছর।
আজকের দিনটি বাংলাদেশের মানুষের একটি সর্বজনীন লোকোৎসব। পহেলা বৈশাখ আমাদের মনের ভেতরের সব ক্লেদ, জীর্ণতা দূর করে আমাদের নতুন উদ্যমে বাঁচার অনুপ্রেরণা দেয়। অতীতের ভুলত্রুটি ও ব্যর্থতার গ্লানি ভুলে নতুন করে সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনায় উদযাপিত হয় নববর্ষ।
বাংলা বছরকে জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদযাপনের লক্ষ্যে বেসরকারি ও জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। আজ শুক্রবার সরকারি ছুটির দিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। অন্যদিকে ছায়ানট ভোরে রমনা বটমূলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।
বরাবরের মতোই এবারের আয়োজন ঘিরে থাকছে জোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ছায়ানট জানায়, ‘রমজান মাসের পবিত্রতা রক্ষা করে, সবাইকে নিয়ে শুভ কর্মপথে চলবার, কণ্ঠে নির্ভয়ের গান তুলে নেবার ছায়ানটের এই আয়োজন সার্থক হবে সর্বজনের সমর্থন, অংশগ্রহণ এবং উপলব্ধিতে।’

এ বছর ‘বরিষ ধরা-মাঝে শান্তির বারি’ প্রতিপাদ্য নিয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রা চারুকলা অনুষদ থেকে সকাল ৯টায় বের করা হবে। ভোরের আলো ফুটতেই রমনার বটমূলে আহীর ভৈরবের সুরে, ছন্দের বন্ধনে এবারের নতুন বছর আবাহন শুরু হবে। গোটা অনুষ্ঠান সাজানো হয়েছে নতুন স্নিগ্ধ আলোয় স্নাত প্রকৃতির গান, মানবপ্রেম-দেশপ্রেম আর আত্মবোধন-জাগরণের সুরবাণী দিয়ে।
নববর্ষের প্রথম প্রভাতে, সত্য-সুন্দরকে পাওয়ার অভিলাষী ছায়ানটের আহ্বান থাকবে, দূর করো অতীতের সব আবর্জনা, ‘ধর নির্ভয় গান’। মঙ্গল শোভাযাত্রা শাহবাগ মোড় হয়ে পুনরায় চারুকলা অনুষদে গিয়ে শেষ হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগ দিনব্যাপী বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দিবসটি উদযাপন করবে। ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠীসহ অন্যান্য সাংস্কৃতিক সংগঠন যথাযোগ্য মর্যাদায় বাংলা নববর্ষ উদযাপন করবে। বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠান আবশ্যিকভাবে জাতীয় সঙ্গীত ও এসো হে বৈশাখ গান পরিবেশনের মাধ্যমে শুরু হবে। নববর্ষের তাৎপর্য এবং মঙ্গল শোভাযাত্রার ইতিহাস ও ইউনেস্কো কর্তৃক এটিকে বিশ্ব সংস্কৃতির ঐতিহ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি তুলে ধরে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও বাংলা একাডেমির উদ্যোগে বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় ক্রোড়পত্র প্রকাশ করবে।
এ উপলক্ষে অন্যদিকে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে। বাংলা নববর্ষে সব কারাগার, হাসপাতাল ও শিশু পরিবারে (এতিমখানা) উন্নতমানের ঐতিহ্যবাহী খাবার ও ইফতারের আয়োজন করা হয়েছে।


এবারের পয়লা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কোনো ধরনের মুখোশ পরা এবং ব্যাগ বহন করা যাবে না। তবে চারুকলা অনুষদ কর্তৃক প্রস্তুতকৃত মুখোশ হাতে নিয়ে প্রদর্শন করা যাবে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ভুভুজেলা বাঁশি বাজানো ও বিক্রি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ক্যাম্পাসে নববর্ষের দিন সব ধরনের অনুষ্ঠান বিকেল ৫টার মধ্যে শেষ করতে হবে। ক্যাম্পাসে বিকেল ৫টা পর্যন্ত প্রবেশ করা যাবে। ৫টার পর কোনোভাবেই প্রবেশ করা যাবে না। এক সময় নববর্ষ পালিত হতো আর্তব উৎসব বা ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে। তখন এর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল কৃষির, কারণ কৃষিকাজ ছিল ঋতুনির্ভর। পরে কৃষিকাজ ও খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য মোঘল সম্রাট আকবরের সময়ে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। হিজরি চান্দ্রসন ও বাংলা সৌর সনের ওপর ভিত্তি করে প্রবর্তিত হয় নতুন এই বাংলা সন। অতীতে বাংলা নববর্ষের মূল উৎসব ছিল হালখাতা। এটি পুরোপুরিই একটি অর্থনৈতিক ব্যাপার। গ্রামেগঞ্জে-নগরে ব্যবসায়ীরা নববর্ষের প্রারম্ভে তাঁদের পুরনো হিসাব-নিকাশ সম্পন্ন করে হিসাবের নতুন খাতা খুলতেন। এ উপলক্ষে তারা নতুন-পুরাতন খদ্দেরদের আমন্ত্রণ জানিয়ে মিষ্টি বিতরণ করতেন এবং নতুনভাবে তাদের সাথে ব্যবসায়িক যোগসূত্র স্থাপন করতেন। চিরাচরিত এ অনুষ্ঠানটি আজও পালিত হয়।মূলত ১৫৫৬ সালে কার্যকর হওয়া বাংলা সন প্রথমদিকে পরিচিত ছিল ফসলি সন নামে, পরে তা পরিচিত হয় বঙ্গাব্দ নামে। কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ সমাজের সাথে বাংলাবর্ষের ইতিহাস জড়িয়ে থাকলেও এর সাথে রাজনৈতিক ইতিহাসেরও সংযোগ ঘটেছে। পাকিস্তানি শাসনামলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয় বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের। আর ষাটের দশকের শেষে তা বিশেষ মাত্রা পায় রমনা বটমূলে ছায়ানটের আয়োজনের মাধ্যমে। এ সময় ঢাকায় নাগরিক পর্যায়ে ছায়ানটের উদ্যোগে সীমিত আকারে বর্ষবরণ শুরু হয়।

আমাদের মহান স্বাধীনতার পর ধীরে ধীরে এই উৎসব নাগরিক জীবনে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। কালক্রমে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান এখন শুধু আনন্দ-উল্লাসের উৎসব নয়, সংস্কৃতির একটি শক্তিশালী ধারক-বাহক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, উৎসবের পাশাপাশি স্বৈরাচার-অপশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদও এসেছে পয়লা বৈশাখের আয়োজনে। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে বের হয় প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রা। যা ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর ইউনেস্কো এ শোভাযাত্রাকে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মর্যাদা দেয়।
নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি : এদিকে রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদ দেশে ও দেশের বাইরে বসবাসরত সব বাংলাদেশীকে বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।

বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে গতকাল বৃহস্পতিবার দেয়া এক বাণীতে তিনি এই শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। আবদুল হামিদ বলেন, ‘পহেলা বৈশাখ বাঙালি জাতির জীবনে একটি পরম আনন্দের দিন। আনন্দঘন এ দিনে আমি দেশে ও দেশের বাইরে বসবাসরত সব বাংলাদেশীকে জানাই বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা।’ তিনি বলেন, ‘বাঙালি জাতির শাশ্বত ঐতিহ্যের প্রধান অঙ্গ পহেলা বৈশাখ। নতুনের বার্তা নিয়ে বেজে উঠে বৈশাখের আগমনী বার্তা। দুঃখ, জরা, ব্যর্থতা ও মলিনতাকে ভুলে সবাই জেগে ওঠে মহানন্দে। ফসলি সন হিসেবে মোঘল আমলে যে বর্ষগণনার সূচনা হয়েছিল, সময়ের পরিক্রমায় তা আজ সমগ্র বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক স্মারক উৎসবে পরিণত হয়েছে।’ রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘পহেলা বৈশাখের মাঝে বাঙালি খুঁজে পায় নিজস্ব ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও চেতনার স্বরূপ। বৈশাখ শুধু উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সাথে জড়িয়ে আছে আমাদের আত্মবিকাশ ও বেড়ে ওঠার প্রেরণা।’

বৈশাখ হবে বিপুল প্রেরণাদায়ী : প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ, উগ্রবাদ তথা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই এবং ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সমাজ তথা সুখী-সমৃদ্ধ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ তথা স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে এবারের বৈশাখ হবে আমাদের জন্য বিপুল প্রেরণাদায়ী। বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে দেয়া এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘শুভ নববর্ষ ১৪৩০। উৎসবমুখর বাংলা নববর্ষের এই দিনে আমি দেশবাসীসহ সব বাঙালিকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।’ তিনি বলেন, ‘পহেলা বৈশাখ বাঙালির সম্প্রীতির দিন, বাঙালির মহামিলনের দিন। এদিন ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমগ্র জাতি জেগে ওঠে নবপ্রাণে নব-অঙ্গীকারে। সারা বছরের দুঃখ-জরা, মলিনতা ও ব্যর্থতাকে ভুলে সবাইকে আজ নব-আনন্দে জেগে ওঠার উদাত্ত আহ্বান জানাই।’ নয়া দিগন্ত/ ছবি- প্রথম আলো

আরো পড়ুন ...