Home মতামত
Category:

মতামত

মুসা আল হাফিজ: প্রবল ঘৃণার চোখ দিয়ে ইসলামকে দেখার চেষ্টা কতটা উদ্ধত, তা আমরা বুঝতে পারি পশ্চিমা বিভিন্ন বুদ্ধিজীবীর জবানিতে। রিচার্ড কোহেন এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯০ সালের ২ মে বিখ্যাত আর্থ টাইমসে নিজের কলামে তিনি লেখেন, ‘পৃথিবী দুই এলাকা। একটি সভ্যতার অপরটি বর্বরতার। প্রথমটি পশ্চিমা, দ্বিতীয়টি ইসলামী। প্রথমটি এনেছে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও মানুষের মুক্তি। দ্বিতীয়টি সব কল্যাণকে দেখিয়েছে রক্তচক্ষু।’ এ-জাতীয় ভাবনার চেনা ছক ধরা পড়েছে স্যামুয়েল পি হান্টিংটনের ভাষায়। তিনি জানান, ‘মানুষ প্রায়ই… আমাদের সভ্যতা ও বর্বরদের সভ্যতা ইত্যাদির নিরিখে ভাবতে ভালোবাসে’। গার্ট্রড বেল কোনো রাখটাক ছাড়াই মুসলিম সভ্যতাকে বর্বর প্রসঙ্গ হিসেবে অভিহিত করেন। কারণ ‘শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ওরা কোনো জ্ঞান বহন করে আনেনি’। ফ্লোরা লুইস প্রকাশ করেছেন আরেকটি ‘গভীর’ কারণ ‘মুসলমানদের ব্যাপারে একটি মনস্তাত্ত্বিক বোধ কাজ করে যে ‘তারা কী নয়?’ মধ্যযুগ থেকে চলে আসা ইতিহাস বলবে- ‘তারা সভ্য মানুষ নয়’।

এসব ‘শতাব্দীর পর শতাব্দীর’ কিংবা ‘মধ্যযুগ থেকে চলে আসা ইতিহাস’ অতঃপর আমাদের মনোযোগের কেন্দ্রে চলে আসে। সত্যিই কি এ সময়টি মুসলিম বর্বরতার? সত্যিই কি মুসলমানরা কল্যাণকে দেখিয়েছে রক্তচক্ষু? সত্যিই কি ‘তারা কোনো জ্ঞান বহন করে আনেনি? সত্যিই কি তারা সভ্য মানুষ নয়? অধিপতি শ্রেণীর পশ্চিমা বুদ্ধিজীবিতা অসভ্যতাকে মুসলমানদের জন্য এবং জ্ঞান ও সভ্যতাকে পাশ্চাত্যের জন্য বরাদ্দ করতে চাইলেও বহু পশ্চিমা ঐতিহাসিক ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় স্বীকার করে নিয়েছেন প্রকৃত সত্য। তাদের বক্তব্যে নিহিত আছে ইসলামের মোকাবেলায় পাশ্চাত্যের শ্রেষ্ঠত্বের দাবির ঐতিহাসিক বিচার!

হিউলেট প্যাকার্ডের সাবেক প্রধান নির্বাহী কালি ফিওরিনার দীর্ঘ বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন এহসানুল করিম তার বিখ্যাত Muslim history and civilization গ্রন্থে। ইসলাম ও ইসলামী সভ্যতা প্রসঙ্গে ফিউরিনার ভাষ্য, ‘সেটি ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ও মহান সভ্যতা। এ সভ্যতা সফল হয়েছিল একটি আন্তঃমহাদেশীয় রাষ্ট্রাতীত রাষ্ট্র বা সুপার স্টেট প্রতিষ্ঠায়। এ দেশের বিস্তার ছিল এক মহাসাগর থেকে আরেক মহাসাগরের তটদেশ অবধি। উত্তরে শীতল আবহাওয়া থেকে নিরক্ষীয় অঞ্চল ও মরু পর্যন্ত প্রসারিত। এ অতিকায় রাষ্ট্রের লাখো-কোটি মানুষের মধ্যে ছিল বহু বিশ্বাসের অস্তিত্ব। নরগোষ্ঠীগত বৈচিত্র্যও ছিল প্রচুর।’

‘ইসলামের অন্যতম ভাষা শত শত দেশের নানা নরগোষ্ঠীর মধ্যে মিলনের সেতুবন্ধন হিসেবে বিশ্বের বৃহৎ অংশের মানুষের ভাষা হয়ে ওঠে। নানা জাতির লোক নিয়ে ইসলামী এই রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী গঠিত হয়। এ রাষ্ট্র এভাবেই তার নাগরিকদের জন্য যে নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি নিয়ে আসে, এর আগে কখনো মানুষের সে রকম স্বস্তিদায়ক অভিজ্ঞতা হয়নি। এ সভ্যতার নাগালে আসে ল্যাতিন আমেরিকা, চীন এবং এই দুই ভূখণ্ডের মধ্যে আরো যত দেশ আছে, সেগুলোও। এ সভ্যতা সবার আগে এগিয়ে যায় তার উদ্ভাবনী প্রতিভায়।’

‘নেতৃত্ব যদি হয় প্রজ্ঞাময়, নেতৃত্ব যদি হয় সংস্কৃতি ও স্থায়িত্বের ধারক, নেতৃত্ব যদি হয় বৈচিত্র্য ও সাহসের প্রতিভূ- সে নেতৃত্ব ইসলামের। এই ইসলাম সুদীর্ঘ ৮০০ বছর পৃথিবীকে দিয়েছে উদ্ভাবনী নেতৃত্ব, সমৃদ্ধ নেতৃত্ব।’

A history of the intellectual development of europe গ্রন্থে John William Draper দেখান পশ্চিমের বুদ্ধিবৃত্তিক নবজীবন লাভে ইসলামের ভূমিকা। তিনি লিখেন, ‘ইউরোপীয় সাহিত্য পরিকল্পিতভাবে মুসলিমদের প্রতি আমাদের মনোযোগ ও দায়িত্বকে এড়িয়ে যাচ্ছে। এর নিন্দা না করলেই নয়। সুনিশ্চিতভাবে বলতে পারি তাদেরকে আর আড়ালে রাখা সম্ভব নয়। ধর্মের প্রতি বীতশ্রদ্ধ ও আমাদের আত্মপ্রচারের বুনিয়াদে প্রতিষ্ঠিত অবিচারকে আর যাই হোক চিরকালের মতো টিকিয়ে রাখা যাবে না। ইউরোপের ওপর বুদ্ধিবৃত্তিক ছাপ রেখে গেছে আরব ঐতিহ্য। আরবদের রেখে যাওয়া এ ছাপ মুছবে না কখনো। আমাদের অভিন্ন গ্রহের তারকারাজি যেভাবে অমোচনীয়, এটি তেমনই একটা কিছু। খলিফাদের শাসনামলে জ্ঞানী খ্রিষ্টান ও ইহুদিদের কেবল পরম শ্রদ্ধার চোখেই দেখা হতো না, নানা গুরুত্ব ও দায়িত্বপূর্ণ পদেও তাদের নিয়োগ দেয়া হতো। তাদেরকে সরকারের শীর্ষ পদগুলোতেও পদোন্নতি দেয়া হতো।

কোনো জ্ঞানী বা বিদগ্ধ ব্যক্তির ব্যাপারে ভাবা হতো না- সে কোথা থেকে এলো? সে কোন ধর্মে বিশ্বাসী? কেবল দেখা হতো এ ব্যক্তি জ্ঞান ও প্রজ্ঞার পরীক্ষায় কতটা উত্তীর্ণ ও আলোকময়, এটিই ছিল একমাত্র বিচার্য বিষয়।

The Making of Humanity (1919) গ্রন্থে ফরাসি চিন্তাবিদ Robert Briffault-এর স্পষ্ট বয়ান, ‘ইউরোপ ক্রমে আঁধারে ডুবে যেতে যেতে বর্বরতায় পৌঁছে যায়। ইউরোপ যখন অজ্ঞতার অতলতলে পৌঁছায়, তখন মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন নগরী- বাগদাদ, কায়রো, কর্ডোভা ও টলেডোর মতো মেগাসিটি নাগরিক সভ্যতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মচাঞ্চল্যের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে ক্রমেই সমৃদ্ধ হচ্ছে। এসব অঞ্চলেই তখন নবজীবনের সঞ্চার হয়। আর সেই প্রেরণায় মানব সভ্যতার বিবর্তনের নতুন স্তর সূচিত হয়। যখন থেকে তাদের সংস্কৃতির প্রভাব অনুভূত হতে থাকে, তখন থেকেই শুরু হয় নতুন জীবনের স্পন্দন।

অক্সফোর্ড স্কুলে তাদের (মুসলিমদের) উত্তরাধিকারী শিক্ষকদের কাছ থেকে রজার বেকন আরবি ভাষা ও আরবদের বিজ্ঞান শিক্ষা করেন। অথচ রজার বেকন যেমন নয়, তেমনি পরের এমন কেউই নেই, যাদেরকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সমীক্ষণ পদ্ধতি প্রবর্তনের কৃতিত্ব দেয়া যায়। রজার বেকন ছিলেন খ্রিষ্টান ইউরোপের জন্য মুসলিম বিজ্ঞান ও পদ্ধতির অন্যতন অবতারসুলভ প্রতিনিধি। আর তিনি নিজে সমসাময়িকদের কাছে স্বীকার করতে কখনো দ্বিধা করেননি যে, আরবি ভাষা ও আরবীয় বিজ্ঞানই হলো সত্যিকারের জ্ঞানার্জনের উপায়।

‘আধুনিক বিশ্বের জন্য আরবদের সবচেয়ে কালজয়ী অবদানের নাম বিজ্ঞান। তবে এর সুফল ফলতে দেরি হয়। ম্যুর সভ্যতা আবার আঁধারে ডুবে যাওয়ার বহুকাল পরে সেই ঘুমিয়ে পড়া বিশাল শক্তি আপন শক্তিতে নিজস্ব সম্ভাবনার পুনর্জন্ম ঘটায়। শুধু বিজ্ঞানই মৃত ইউরোপকে পুনরুজ্জীবিত করল, তা নয়। ইসলামী সভ্যতার আরো বহু প্রভাব ইউরোপীয় জীবনের আকাশকে প্রথমবার আলোকিত করেছে।’

Edgar Swain-এর বিখ্যাত A history of world civilization আমাদেরকে জানায় তার পর্যবেক্ষণ। তিনি লিখেন, ‘মুসলিম সভ্যতা ছিল সংমিশ্রিত সভ্যতা। তা বিলীয়মান ভারতীয়, বাইজেন্টাইন, পারসিক ও মিসরীয় সভ্যতা থেকে ভাবনা-চিন্তা আহরণ করেছিল। এসব সভ্যতায় এর আগে যে কাজ শুরু হয়েছিল, মুসলমানরা তা অব্যাহত রাখেন এবং রেনেসাঁর গোড়াপত্তনের সহায়ক শক্তি হিসেবে পাশ্চাত্য জনগণের কাছে তা পৌঁছে দেন। পাশ্চাত্যের চিকিৎসা, গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও শিল্পকলা ব্যাপকভাবে আরবি জ্ঞানের ওপর নির্ভরশীল ছিল।

এডগার সোওয়াইনের মন্তব্য পুরো সত্যকে প্রকাশ করছে না। আরবদের কেবল পুরনো জ্ঞানের বাহক বলে চিত্রিত করছে। তবে তার অনিচ্ছুক মনকেও স্বীকার করতে হয়েছে আরবি জ্ঞানের ওপর পাশ্চাত্যের ব্যাপক নির্ভরতার কথা। কিন্তু বিষয়টি কি আসলে এতটুকুই? কেবলই আরবরা প্রাচীন জ্ঞানের বাহক ছিলেন? আধুনিক জাগরণের সহায়ক ছিলেন? ভারতীয় প্রাজ্ঞজন জওয়াহেরলাল নেহরুর Glimpses of world history-এ প্রশ্নের জবাব পেতে আমাদের সাহায্য করবে। পূর্ববর্তী সভ্যতাগুলোর চেয়ে আরবদের জ্ঞানচর্চার শ্রেষ্ঠত্ব এবং ইউরোপীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানে আরবদের জনক ভূমিকার বর্ণনা দেন নেহরু। লিখেন, ‘প্রাচীন মিসর, চীন কিংবা ভারতে আমরা সুশৃঙ্খল বৈজ্ঞানিক রীতি-পদ্ধতি দেখতে পাই না। প্রাচীন গ্রিসে মাত্র এর সামান্য উপস্থিতি দেখা যায়। পুনর্বার এর অনুপস্থিতিই চোখে পড়ে। কিন্তু আরবদের এই বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান-স্পৃহা প্রবল ছিল। সুতরাং তাদেরকেই আধুনিক বিজ্ঞানের জনক হিসেবে বিবেচনা করা যায়।’

বিজ্ঞানেই সীমাবদ্ধ ছিল না এ ভূমিকা। ইউরোপের ওপর আরবদের প্রভাব ছিল সামাজিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, সামগ্রিক। আরব সভ্যতা তার সামগ্রিক ঔজ্জ্বল্য ও প্রাণশক্তি দিয়ে ইউরোপকে নিজের দিকে টানছিল এবং জীবনীশক্তি সরবরাহ করছিল। ইউরোপের ভেতরে সে ছিল প্রধান এক সভ্যতা, আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। খ্রিষ্টীয় ইউরোপে এ প্রভাবের প্রধান কারণ বলে যা বিবেচিত হতো, তা হলো সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক নানামুখী পরিবর্তন, যাকে শুধু বৈপ্লবিক বলেই আখ্যায়িত করা যায়। স্পেন ও সিসিলির পথ ধরে ইউরোপময় ছড়াতে থাকে সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লবের ভ্রুণ।

একান্তই মুসলিম উপাদানে উজ্জীবিত এ বিপ্লব ছিল তীব্র ও ব্যাপক; যা বদলে দিয়েছিল বিশ্বের ইতিহাস। চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তির এই নতুন জোয়ার নিয়ে ইসলাম মানবমন ও ইউরোপের নিয়তিকে যে জায়গায় নিয়ে গেল, সেখান থেকে জন্ম নিলো নতুন এক পৃথিবী। এইচ জি ওয়েলস দেখিয়েছেন, ‘মেধার বিস্তার ও বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণে মুসলিম সভ্যতা সমকালীন ও পূর্ববর্তী অন্যান্য সভ্যতাকে পেছনে ফেলেছিল, এমনকি এ ক্ষেত্রে পাশ্চাত্যের বহুল প্রশংসিত গ্রিক সভ্যতাও আরবদের তুল্য হতে পারেনি।’

এটিই ছিল রেনেসাঁর মূল। এরই প্রভাবে জন্ম নিয়েছিল নতুন পৃথিবী। জ্ঞানে, কর্মে, শিল্পে ও সাহিত্যে প্রাণময় ইউরোপ। যার সূচনাবিন্দু ধরে নেয়া হয় চতুর্দশ শতকে ইতালিতে, বিস্তৃতি ষোড়শ শতক অবধি। ইংল্যান্ডে এর শুরু ১৫ শতকের প্রথম পাদে। প্রাচীন গ্রিক ও ল্যাটিন সাহিত্য শিল্পের পুনরুত্থানের কারণেই এ জাগরণ- এমনই দাবি উচ্চারিত হয় অবিরাম। কিন্তু প্রকৃত সত্য হচ্ছে, ‘পঞ্চদশ শতাব্দীতে নয়, প্রকৃত রেনেসাঁসের উদ্ভব ঘটেছিল আরব ও মূর-সংস্কৃতির প্রভাবের ফলেই। ইতালি নয়, স্পেনই ছিল ইউরোপের পুনর্জন্মের সূতিকাগৃহ’। ‘এ সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না যে, আরবরা ব্যতীত আধুনিক সভ্যতাসূর্য আদৌ উদিত হতো না। এটি নিরঙ্কুশভাবে নিশ্চিত যে, তারা ছাড়া ইউরোপ বিবর্তনের অতীত সব পর্যায় অতিক্রমে সক্ষম দৃঢ় চরিত্রের অধিকারী হতে পারত না। তবুও ইউরোপীয় উন্নতির এমন একটিও দিক নেই, যেখানে ইসলামী সংস্কৃতির নিশ্চিত প্রভাব দৃশ্যমান নয়। অন্য কোথাও তা এমন জাজ্বল্যমান ও গুরুত্বপূর্ণ নয়, যেমনটি ঘটেছে সেই শক্তির উৎপত্তিতে, যা আধুনিক বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ স্বাতন্ত্র্যচিহ্নিত ও এর চূড়ান্ত বিজয়ের উৎসকে নির্মাণ করে। এ শক্তি হলো প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক চেতনা।’

ইসলামের প্রভাব শুধু জ্ঞান-বিজ্ঞানকেন্দ্রিক ছিল না, ছিল সর্বমাত্রিক; সামাজিক-সাংস্কৃতিক, জীবনদৃষ্টিগত। যার কেন্দ্রে ছিল উদার মানবিকতা। মুসলিমরা বিজয় অর্জনের পর কেমন আচরণ করতেন খ্রিষ্টানদের সাথে? ‘ছিঁড়ে কুটি কুটি করার যে অভিযোগ, তারই বা বাস্তবতা কতটুকু? এ অভিযোগের সারবত্তাকে নাকচ করে দেন সি এইচ বেকার। এহসানুল করিম তার Muslim history and civilization-এ হাজির করেন বেকারের জবানি। বেকার লিখেন, ‘আমরা যদি ইসলামের বিজেতাদের নির্বিকারচিত্ততার কথা মনে রাখি, তা হলে একটি ধারণার সম্ভাবনা অত্যন্ত প্রবল হয়ে ওঠে। সেটি ইসলামী রাষ্ট্রে খ্রিষ্টানদের মর্যাদার ধারণা। ইসলামী রাষ্ট্র বা উম্মাহর আওতায় খ্রিষ্টানরা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদ, এমনকি উজিরের পদ পর্যন্ত পেয়েছে। সে জন্য তাকে তার ধর্মবিশ্বাস বিসর্জন দিতে হয়নি। এমনকি মুসলমানদের বিরুদ্ধে যখন খ্রিষ্টানদের ধর্মযুদ্ধ চলছে, যখন ধর্মীয় বিরোধিতা প্রবল ও তীব্র হয়ে উঠেছে খোদ খ্রিষ্টানদের নিজেদের নীতির কারণে, তখনো ইসলামী রাষ্ট্রে খ্রিষ্টান কর্মকর্তাদের সচরাচর সাক্ষাৎ পাওয়া যাবে, এটি আশার অধিক। তবু এ ধারণার পরও বলা যায়, মুসলিম বিজেতা ও তাদের উত্তরাধিকারীরা খ্রিষ্টান ধর্মের বিরুদ্ধে ধর্মান্ধ ঘৃণার পথ অনুসরণ করেছে, এ তত্ত্ব খ্রিষ্টানদেরই আবিষ্কার করা কল্পকাহিনী মাত্র।

ফরাসি বহুবিদ্যাবিশারদ Gustave Le Bon-এর জবানিতে একই সত্যের উচ্চারণ আমরা শুনি। মুসলিম সভ্যতার বিশ্লেষণে তার La Civilisation des Arabes (1884) বিশ্ববিখ্যাত। পরে ইংরেজিতে গ্রন্থটি অনূদিত The World of Islamic Civilization নামে। বইটি জানায়, মুসলিমদের বহুমাত্রিক প্রভাবের বিবৃতি। গুস্তাব লিখেন-

‘ইসলামের আবির্ভাবের মাত্র একটি শতাব্দীকালের মধ্যে ইসলামশাসিত সব অঞ্চলেই বিস্ময়কর সমৃদ্ধি সাধিত হয়েছিল। এই সর্বব্যাপী সমৃদ্ধির কারণ ইসলাম নিজেই; কারণ তার অবিনাশী অম্লান, মঙ্গলময় আদর্শ। এর অন্তর্নিহিত বিশ্বাসের কুসুমরাজি প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের স্বাভাবিকতার সাথে সম্পূর্ণ একই সুতায় গাঁথা। এ বিশ্বাসের সারনির্যাস আমাদের চরিত্রকে সুন্দরভাবে নির্মাণ করে, আমাদের কাজকর্মে মমতার অনুভূতি সৃষ্টি করে এবং আমাদের বিশ্বাস, ধর্ম ও বিধিব্যবস্থার প্রতি সহনশীল হতে আদেশ দেয়।’

এই যদি হয় সত্য, তবে যে সব খ্যাতিমান ঐতিহাসিক, বুদ্ধিজীবী, দার্শনিক ইসলাম ও মুসলিম সভ্যতাকে অভিশাপ, উন্মত্ততা ও বর্বরতার জমি বলে চিত্রিত করলেন, তাদের বক্তব্যের কী তাৎপর্য? স্যার এম এন রায় এর মতে, সেটি এক ‘হীন মতবাদ’ এবং তা বস্তুনিষ্ঠতার দিক থেকে ‘রূপকথার মালা’ মাত্র। বিখ্যাত The Historical Role Of Islam : An Essay On Islamic Culture গ্রন্থে তিনি লিখেন, ‘আজ শিক্ষিত বিশ্ব এই হীন মতবাদ প্রত্যাখ্যান করেছে, ইসলামের উত্থান ছিল সদাচারি ও ধৈর্যশীল মানুষদের ওপর ধর্মোন্মত্ততার বিজয়।’

তার স্পষ্ট উচ্চারণ- ‘ইতিহাসের পক্ষপাতহীন ও বৈজ্ঞানিক গবেষণা যখন গাঁজাখুরি রূপকথার মালাকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করছে, বিদ্বেষপরায়ণ গালগল্পগুলোকে মসিলিপ্ত করছে, তখন ইসলামের উত্থান দৃঢ় ভিত্তি পাচ্ছে মানবজাতির জন্য অভিশাপ হিসেবে নয়, পরম আশীর্বাদ হিসেবেই।

এতক্ষণ আমরা যে সব ভাষ্য পেশ করলাম, তা এক কথায় আধুনিক সভ্যতার মৌলিক অর্জনগুলোর জনক হিসেবে মুসলিমদের ঋণ স্বীকার করেছে। বিশেষত সামাজিক সৌহার্দ্য, ধর্মীয় সহনশীলতা, জ্ঞান-গবেষণা, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, আইনের শাসন ও মানবীয় মহত্বের প্রাণশক্তি দিয়ে অন্ধকার ইউরোপকে তারা আলোকিত করেন। তারা জ্ঞানের বাহক ও প্রজ্ঞার ধারক হিসেবে বিশ্বকে পথপ্রদর্শন করেছেন। তারা ফেরি করেছেন সভ্যতা। সভ্যতার প্রতিটি উপাদানকে প্রদীপ্ত করার কাজ করেছেন নিরবচ্ছিন্নভাবে। তাদের হাত ধরে ইউরোপ ‘এজ অব ডার্কনেস’ থেকে পায় উত্তরণ।

লেখক : কবি, গবেষক

0 comment
0 FacebookTwitterPinterestEmail

ঢাকা, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২: পবিত্র লাইলাতুল মেরাজ বা শবেমেরাজ আজ। লাইলাতুন বা শব অর্থ হলো- রাত আর মেরাজ অর্থ ঊর্ধ্বগমন। শবেমেরাজ বা লাইলাতুল মেরাজের অর্থ দাঁড়ায়- ঊর্ধ্বগমনের রাত।
ব্যাপক অর্থে রাসূল (সা:)-এর বায়তুল্লাহ শরিফ থেকে বায়তুল মুকাদ্দাসে উপনীত হয়ে সেখান থেকে সপ্তাকাশ এবং আরশে আজিম পৌঁছে আল্লাহর সাথে কথা বলাকেই মেরাজ বলে। রাসূল (সা:)-এর ৫২ বছর বয়সে অর্থাৎ নবুয়তের ১২তম সনে রজব মাসের ২৬ তারিখ দিনগত রাতে মেরাজের আশ্চর্যতম ঘটনাটি সংঘটিত হয়।
শবেমেরাজ আল্লাহর অসীম কুদরত। মেরাজের ঘটনা সম্পর্কে মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুরআনের সূরা বনি ইসরাইলের ১ নম্বর আয়াতে ঘোষণা করেন- ‘মহামহিম পরম পবিত্র সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাতে ভ্রমণ করিয়েছেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত। যাতে আমি তাকে দেখিয়ে দেই, এর চারপাশের নিদর্শনগুলো, যা বরকতময়। নিশ্চয়ই তিনি পরম শ্রবণকারী ও দর্শনশীল।’
হাদিস সূত্রে জানা যায়, রজব মাসের ২৬ তারিখ রাতে রাসূল (সা:) এশার নামাজ শেষে হজরত উম্মে হানী (রা:)-এর ঘরে ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন। এ সময় হজরত জিব্রাইল (আ:) আল্লাহ তায়ালার হুকুমে জান্নাত থেকে বোরাক নামের একটি সাওয়ারি আর অসংখ্য ফেরেশতা নিয়ে রাসূল (সা:)-এর কাছে হাজির হয়ে সালাম দিয়ে বললেন, হুজুর! আপনার প্রতিপালক আপনাকে স্মরণ করেছেন, এ মুহূর্তেই আপনাকে সেখানে যেতে হবে। মুহাম্মদ (সা:) প্রস্তুত হলে জিবরাইল (আ:) রাসূল (সা:)-কে নিয়ে কাবা শরিফের হাতিমে যান। জমজমের পানিতে অজুর পর বোরাক নামক বাহনে জেরুসালেমের বায়তুল মুকাদ্দাসে গিয়ে নামাজ আদায় করেন। সেখানে থেকে প্রথম আকাশে পৌঁছান মহানবী (সা:)। সেখানে হজরত আদম (আ:)-এর সাথে সাক্ষাৎ করেন। এভাবে সাত আকাশ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে সাক্ষাৎ করেন হজরত ঈসা (আ:), হজরত ইয়াহইয়া (আ:), হজরত ইদ্রিস (আঃ), হজরত হারুন (আ:), হজরত মুসা (আ:) এবং হজরত ইব্রাহিম (আ:)-এর সাথে।
সপ্তম আকাশ থেকে হজরত মুহাম্মদ (সা:)-কে বায়তুল মামুর পরিদর্শনে নেয়া হয়, যেখানে প্রতিদিন (সকাল-সন্ধ্যায়) ৭০ হাজার ফেরেশতা তাওয়াফ করেন ও প্রস্থান করেন; তাঁরা দ্বিতীয়বার আর সেখানে আসার সুযোগ পান না। এরপর তিনি সিদরাতুল মুনতাহার কাছে যান। সেখান থেকে রফরফ নামক বিশেষ বাহনে আরশে আজিম যান। এক ধনুক দূরত্ব থেকে আল্লাহর সাথে কথোপকথন হয়। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে- অতঃপর তিনি নিকটবর্তী হলেন, তাদের মধ্যে ধনুকের দুই মাথার ব্যবধান রইল অথবা আরো নিকটে। তখন আল্লাহ তাঁর বান্দার প্রতি প্রত্যাদেশ করলেন যা করার ছিল।
হাদিসের বর্ণনা মতে, শবেমেরাজে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হয় মহানবী (সা:)-এর উম্মতদের জন্য। এ ছাড়া দেখেছেন অনেক নিদর্শন। দেখেছেন জান্নাতের নেয়ামত ও জাহান্নামের শাস্তি। হাদিসের বিখ্যাত গ্রন্থ বুখারি ও মুসলিমের বর্ণনায় ওঠে আসা কয়েকটি শাস্তির বিবরণ তুলে ধরা হলো- বেনামাজির শাস্তি : বড় পাথর দিয়ে তার মাথায় আঘাত করা হচ্ছে, আঘাতে মাথা ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে, পুনরায় ভালো হয়ে যাচ্ছে, আবার আঘাত করা হচ্ছে। জাকাত না দেয়ার শাস্তি : তাদের সামনে ও পেছনে পাওনাদাররা থাকবে। তারা পশুর মতো চরবে আর নোংরা আবর্জনা ময়লা ও পুঁজ এবং কাঁটাযুক্ত আঠালো বিষাক্ত ফল খাবে, জাহান্নামের উত্তপ্ত পাথর ভক্ষণ করবে। চোগলখোরের শাস্তি : তাদের পার্শ্বদেশ হতে গোশত কেটে তাদের খাওয়ানো হচ্ছে; আর বলা হচ্ছে, যেভাবে তোমার ভাইয়ের গোশত খেতে, সেভাবে এটা ভক্ষণ করো। গিবতকারীদের শাস্তি : তাদের অগ্নিময় লোহার নখর দিয়ে তারা তাদের চেহারা ও বক্ষ বিদীর্ণ করছে। এসব দেখে রাসূল (সা:) বললেন- হে জিবরিল আলাইহিস সালাম! এরা কারা? তিনি (জিবরিল) বললেন, এরা হলো সেসব লোক যারা পশ্চাতে মানুষের গোশত খেত (আড়ালে সমালোচনা করত)। সুদখোরের শাস্তি : সুদখোরদের বড় বড় পেট, যার কারণে তারা তাদের অবস্থান থেকে নড়াচড়া করতে পারছে না। তাদের সাথে রয়েছে ফেরাউন সম্প্রদায়, তাদেরকে অগ্নিতে প্রবিষ্ট করানো হচ্ছে। ব্যভিচারী নারী ও পুরুষের শাস্তি : জেনাকার বদকার নারী, যারা ব্যভিচার করেছে এবং ভ্রƒণ ও সন্তান হত্যা করেছে, তাদের পায়ে আংটা লাগিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে; তারা আর্তচিৎকার করছে। এক সম্প্রদায় তাদের সামনে একটি উত্তম পাত্রে উপাদেয় তাজা ভুনা গোশত এবং অন্য নোংরা একটি পাত্রে পচা মাংস। তারা উত্তম পাত্রের উন্নত তাজা সুস্বাদু গোশত রেখে নোংরা পাত্রের পচা মাংস ভক্ষণ করছে। রাসূল (সা:) বললেন, হে জিবরাইল! (আ:) এরা কারা? তিনি বললেন, এরা হলো ওই সব পুরুষ যারা স্বীয় বৈধ স্ত্রী রেখে অন্য নারীর কাছে গমন করেছে এবং ওই সব নারী যারা স্বীয় বৈধ স্বামী রেখে পরপুরুষগামিনী হয়েছে।
মেরাজ শেষে পৃথিবীতে ফিরে রাসূল (সা:) পুরো ঘটনা হজরত আবু বকর (রা:)-এর কাছে বর্ণনা করেন। তিনি নিঃসংশয়ে তা বিশ্বাস করেন। রাসূল (সা:) তাকে সিদ্দিকী বা বিশ্বাসী খেতাব দেন। মক্কার কাফেররা রাসূলের মেরাজের ঘটনাকে অবিশ্বাস করে।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন : শবেমেরাজ উদযাপন উপলক্ষে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে আজ বাদ জোহর ‘পবিত্র শবেমেরাজ’র ‘গুরুত্ব ও তাৎপর্য’ শীর্ষক আলোচনা সভা, দোয়া ও মুনাজাত অনুষ্ঠিত হবে। ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। নয়া দিগন্ত

0 comment
0 FacebookTwitterPinterestEmail

আইসিসির বর্ষসেরা ক্রিকেটার হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছেন পাকিস্তানের মোহাম্মদ রিজওয়ান। ২০২১ সালের টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটার অব দ্য ইয়ার নির্বাচিত হয়েছেন পাকিস্তানের এই উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান।

২০২১ সালে টি-টোয়েন্টিতে ২৯টি ম্যাচের ২৬ ইনিংসে ব্যাটিং করে ৭৩.৬৬ গড়ে এক সেঞ্চুরি ও ১২ হাফ সেঞ্চুরিতে করেছেন ১ হাজার ৩২৬ রান। গত বছর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও ছিলেন ধারাবাহিকতার মূর্ত প্রতীক। বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচে রিজওয়ানের ৫৫ বলে ৭৯ রানের দুর্দান্ত এক ইনিংস খেলার পথে বিশ্বকাপে ভারতকে প্রথমবার হারিয়েছিল পাকিস্তান।

বিশ্বকাপে শুধু ব্যাট হাতে আলো ছড়াননি, অদম্য মানসিকতার পরিচয়ও দিয়েছিলেন রিজওয়ান। সেমিফাইনালের আগে বুকে ব্যথা নিয়ে ছিলেন হাসপাতালে ভর্তি। সেই অবস্থায় তিনি ডাক্তারকে জানিয়েছিলেন, ‘আমি সেমিফাইনাল খেলতে চাই।’ শেষ পর্যন্ত খেলেছেনও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সেমিফাইনালে। দল জিততে না পারলেও রিজওয়ান করেছিলেন হাফ সেঞ্চুরি।

গত বছর রিজওয়ানের শুরুটাও ছিল দুর্দান্ত। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ঘরের মাঠে বছরের প্রথম টি-টোয়েন্টি ম্যাচেই করেছিলেন সেঞ্চুরি। পরের ম্যাচে করেছিলেন ৫১। এরপর দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজেও ব্যাটে রানের ফোয়ারা ছুটিয়েছিলেন। বছরজুড়েই টি-টোয়েন্টি সংস্করণে বোলারদের ঘাম ছুটিয়েছেন রিজওয়ান। এক পঞ্জিকাবর্ষে টি-টোয়েন্টিতে সর্বোচ্চ রান, হাফ সেঞ্চুরি, সবচেয়ে বেশি বল খেলা, বাউন্ডারি—সবকিছুতেই ছিলেন এক নম্বরে। দারুণ সব কীর্তি গড়ার পর টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটার অব দ্য ইয়ার নির্বাচিত হয়ে সেসবের স্বীকৃতি পেলেন রিজওয়ান।

0 comment
0 FacebookTwitterPinterestEmail